ঢাকা ৩০ আগস্ট, ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম
ওয়ালটন হাই-টেকের শক্তিশালী আর্থিক অগ্রগতি, ১৮০ শতাংশ নগদ ও ১০ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ সুপারিশ জলসিঁড়ি প্রকল্পের বিরুদ্ধে রূপগঞ্জবাসীর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবালের ওয়ালটন করপোরেট অফিস পরিদর্শন জুলাই আন্দোলনে মানবতাবিরোধী অপরাধ: সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিবসহ ২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে উড্ডয়নের ২০ মিনিট পরই বিধ্বস্ত প্রশিক্ষণ বিমান, নিহত ২ পাইলট পাকিস্তান-সৌদি-তুরস্কের প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশ, কী হবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কর কর্মকর্তা আব্দুল আলিম সরকারের বিরুদ্ধে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ: নামে-বেনামে বহুতল ভবন, প্লট ও বিপুল সম্পদের তথ্য রিফাইনারির অনুমতি পেতে আগের নাকচের তথ্য গোপন: তদন্তে বিপিসি সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্কের জোটে বাংলাদেশ: সামনে বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা ব্যক্তির বক্তব্য নয়, পররাষ্ট্রনীতি হতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক

রোহিঙ্গা সংকটের ৯ বছর, প্রত্যাবাসনের খাতা এখনো শূন্য

#

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৫ আগস্ট, ২০২৬,  1:04 PM

news image

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর দমন-পীড়ন ও সহিংসতার মুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে শুরু করেন। দেখতে দেখতে সেই সংকটের নয় বছর পূর্ণ হলো মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট)। তবে দীর্ঘ এই সময়েও একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন করা সম্ভব হয়নি।

নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি রাখাইনে। বরং সময়ের সঙ্গে সংকট আরও জটিল হয়েছে। ২০২৪ সাল থেকে মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) মধ্যে সংঘাত তীব্র হলে নতুন করে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে থাকেন।

বিশ্ব শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের যোগাযোগ কর্মকর্তা শারি নিজমান বার্তা২৪.কমকে জানিয়েছেন, ৩১ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা ১২ লাখ ২ হাজার ৩৪ জন। এর মধ্যে ১৯৯০-এর দশকে নিবন্ধিত শরণার্থী ৩৯ হাজার ৮৫৬ জন। ২০১৭ সালের পর বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা ১০ লাখ ৭ হাজার ৪৮৮ জন। আর ২০২৪ সাল থেকে নতুন করে এসেছে ১ লাখ ৫৪ হাজার ৬৯০ জন।

এ অবস্থায় রোহিঙ্গা সংকটের নয় বছর পূর্তিতে প্রশ্ন উঠছে—কবে ফিরবে রোহিঙ্গারা, কোন পরিবেশে তাদের ফেরানো হবে এবং মিয়ানমারের যে ভূখণ্ডে তাদের ফেরত পাঠানোর কথা, সেই রাখাইনের নিয়ন্ত্রণই বা এখন কার হাতে?

দুই দফা উদ্যোগ, ফেরেনি একজনও

২০১৭ সালের পর রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দ্বিপক্ষীয়ভাবে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়। বড় পরিসরে প্রত্যাবাসনের জন্য ২০১৮ সালের নভেম্বর ও ২০১৯ সালের আগস্টে দুই দফা আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও কোনো রোহিঙ্গা স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে ফিরে যেতে রাজি হননি।

শরণার্থী বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, ২০১৭ সালে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসার পর থেকেই প্রত্যাবাসনের জন্য দ্বিপক্ষীয়ভাবে কাজ করে আসছে বাংলাদেশ।

তার মতে, ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর মিয়ানমারের সঙ্গে প্রত্যাবাসন চুক্তি, ১৯ ডিসেম্বর টাস্কফোর্স গঠন এবং ২০১৮ সালের ১৮ জানুয়ারি যৌথ কর্মপরিকল্পনা বা ‘ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট’ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে প্রত্যাবাসনকে শুধু সময় নির্ধারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। রোহিঙ্গাদের পরিচয়, নাগরিকত্ব ও অধিকার নিয়ে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বিরোধগুলোকেও আলোচনার কেন্দ্রে আনতে হবে।

ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গার সভাপতি সৈয়দ উল্লাহ বলেন, প্রত্যাবাসনের জন্য নির্দিষ্ট ধাপ বাস্তবায়নে একটি কৌশলগত পরিকল্পনা প্রয়োজন। শুধু প্রত্যাবাসনের ঘোষণা দিলেই তা বাস্তবে সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, ২০১৮ সাল থেকে রোহিঙ্গারা প্রত্যাবাসনের কথা শুনে আসছেন। কিন্তু বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

রাখাইনের নিয়ন্ত্রণই বড় প্রশ্ন

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পথে নতুন করে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে রাখাইন রাজ্যের পরিবর্তিত সামরিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি।

২০২৪ সাল থেকে মিয়ানমারের জান্তা বাহিনীর সঙ্গে আরাকান আর্মির সংঘাত তীব্র হওয়ার পর রাখাইনের বিস্তীর্ণ এলাকায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে রাজ্যটির বড় একটি অংশ আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা বলা হয়েছে।

এ কারণে মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যমান সমঝোতা বর্তমান বাস্তবতায় কতটা কার্যকর করা সম্ভব, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

রোহিঙ্গা যুবনেতা ও আরাকান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মুজিবুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকট শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়; এটি আন্তর্জাতিক সংকট। তার মতে, রাখাইনের বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে প্রত্যাবাসনের পরিকল্পনা করলে তা কার্যকর হবে না।

প্রত্যাবাসন ইস্যুতে চীন ও ভারতের সঙ্গেও প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক পদক্ষেপ ও সমঝোতা তৈরির ওপর জোর দেন তিনি।

অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিনও রাখাইনে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি প্রত্যাবাসন পরিকল্পনায় বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

তার প্রশ্ন, মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের যে সমঝোতা রয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটি বাস্তবায়নের সক্ষমতা তাদের কতটা আছে?

নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও মর্যাদার নিশ্চয়তা চান রোহিঙ্গারা

অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিনের মতে, প্রত্যাবাসনের আগে রোহিঙ্গাদের অন্তত তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি—আইনি স্বীকৃতি, নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা এবং মানবিক মর্যাদা।

নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলে রোহিঙ্গাদের আবারও ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেওয়া হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

ইউএনএইচসিআরের কক্সবাজার সাব-অফিসের প্রধান মার্সেল কলুন বলেন, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। কিন্তু নয় বছর পরও কীভাবে সেই প্রত্যাবাসন হবে, তার একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই।

তার মতে, মিয়ানমারে চলমান সংঘাত বন্ধ করা প্রত্যাবাসনের অন্যতম প্রধান শর্ত। কারণ নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো হলে সেই প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না।

নয় বছরেও কাটেনি অনিশ্চয়তা

২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে একের পর এক শরণার্থী শিবির গড়ে ওঠে। সময়ের সঙ্গে এসব শিবিরে নতুন প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে, যারা মিয়ানমারের নাগরিক হয়েও জন্মের পর থেকেই শরণার্থী জীবন কাটাচ্ছে।

নয় বছর ধরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়, খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিরাপত্তার বড় দায়িত্ব বহন করছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপরও এই বিশাল মানবিক কার্যক্রম অনেকাংশে নির্ভরশীল।

এর মধ্যে ২০২৪ সালের পর রাখাইনের সংঘাত থেকে নতুন করে রোহিঙ্গা আসায় সংকট আরও জটিল হয়েছে। পুরোনো রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন যেমন সম্ভব হয়নি, তেমনি নতুন করে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও নিবন্ধনের বিষয়টিও সামনে এসেছে।

পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক, নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ফোরামগুলোতে কূটনৈতিক চাপ তৈরির চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

তবে বাস্তবতা হলো, নয় বছর পরও প্রত্যাবাসনের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা নিরাপত্তা ও আস্থার সংকট। রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরতে চান, কিন্তু নাগরিকত্ব, অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদার নিশ্চয়তা ছাড়া তারা ফিরতে প্রস্তুত নন।

রাখাইনে চলমান সংঘাত, পরিবর্তিত নিয়ন্ত্রণ পরিস্থিতি এবং মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকার ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীর দ্বন্দ্বের কারণে প্রত্যাবাসনের পথ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

ফলে ২০১৭ সালের সেই ২৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ২৫ আগস্ট—নয় বছর পেরিয়ে গেলেও প্রত্যাবাসনের খাতা এখনো শূন্য। বরং সময়ের সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট আরও দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল হয়ে উঠছে।

বড় অঙ্কের ঋণে অ

logo

সম্পাদক ও প্রকাশক : তানভীর সানি